রেকর্ড সর্বোচ্চে স্বর্ণ ও বিটকয়েনের দাম

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বাড়ছে আপৎকালীন বিনিয়োগই এখন বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় ভরসা

সাতদিনেও শাটডাউনের অচলাবস্থা ভাঙতে পারেনি বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি খাত।

সাতদিনেও শাটডাউনের অচলাবস্থা ভাঙতে পারেনি বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি খাত। বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতে এখনো রয়ে গেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি সৃষ্ট অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ও শিল্পোৎপাদনেও। দেশে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন নিয়ে বিপাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও। এসব সংকটকে আরো প্রকট করে তুলেছে ভূরাজনীতি। সব মিলিয়ে ক্রমেই আরো অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিতে স্বর্ণ ও বিটকয়েনের মতো আপৎকালীন বিনিয়োগের ওপর দিন দিন আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে স্বর্ণ ও বিটকয়েনের দামও বাড়তে বাড়তে রেকর্ড ভেঙে চলেছে বারবার।

চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার শুরু জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর পরই। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বড় বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর শুল্ক চাপিয়ে দেন। এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়ে চলেছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে বাজারে কোনো না কোনো প্রভাব দেখা গেছে। বর্তমানে দেশটিতে চলমান সরকারি শাটডাউনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ বন্ধ রয়েছে। এ বিলম্ব বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, যা বিকল্প বিনিয়োগের দিকে তাদের ঝোঁক আরো তীব্র করছে। তবে এ প্রবণতায় বিপজ্জনক পতনের আভাসও দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতি প্রণয়নের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সম্প্রতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যানে জেরোম পাওয়েলের মধ্যে টানাপড়েন বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এ ধরনের হস্তক্ষেপ অন্যান্য অর্থনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি জাপানে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন সানায়ে তাকাইচি। তার অর্থনৈতিক দর্শন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি সরকারের আর্থিক নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। সেক্ষেত্রে এ দর্শনের প্রয়োগ ঘটাতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। আবার বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি নিয়ে দোটানায় রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও।

অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতার পক্ষে নেই। গাজা-ইসরায়েল ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের পাশাপাশি একাধিক নতুন ঘটনা আর্থিক বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বাজেট ও মন্ত্রিসভাবিষয়ক বিতর্কের মাঝে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু মাত্র এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন, যা ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে শেয়ার ও বন্ড বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তান, ভেনিজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের0কঠোর অভিবাসননীতি বিভিন্ন দেশ, এমনকি মার্কিন অর্থনীতির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন অর্থনীতিতে শ্রমবাজার ও মূল্যস্ফীতিসহ অন্যান্য সূচকের বিপরীতে শেয়ারবাজারের উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ডলারের অবমূল্যায়ন ঘটছে। এটিও স্বর্ণ ও বিটকয়েনসহ অন্যান্য আপৎকালীন বিনিয়োগের চাহিদা বাড়াচ্ছে। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বিটকয়েনের চাহিদা বৃদ্ধিতে নীতিসহায়তা নিয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত মাসে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো সুদহার কর্তন করে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। একই সঙ্গে শিগগিরই আরো দুই দফা কর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ফেডের সুদহার কমানোর সম্ভাবনা ও যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউনের মতো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে প্রথমবার স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ডলার স্পর্শ করে। গতকাল দুপুর নাগাদ স্পট মার্কেটে তা উঠে আসে ৪ হাজার ৩৯ ডলার ১০ সেন্টে। স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও বেড়েছে। আপৎকালীন বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত মূল্যবান ধাতুটির দাম ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ ডলার ৭৮ সেন্টে, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ মূল্য ৪৯ ডলার ৫১ সেন্টের কাছাকাছি।

চলতি বছরের শুরুতে আউন্সপ্রতি স্বর্ণের মূল্য ছিল ২ হাজার ৬৬৯ ডলার। এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী মূল্যবান এ ধাতুপণ্যের চাহিদা ক্রমেই বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয় বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আশঙ্কা। এছাড়া ডলারের দুর্বলতা স্বর্ণকে অন্য মুদ্রা ব্যবহারকারীদের জন্য তুলনামূলকভাবে সস্তা করে তুলেছে।

এদিকে ডিজিটাল স্বর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত বিটকয়েনের দাম গত রোববার ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল্য চলতি বছরের শুরু থেকে ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের ক্রিপ্টোবান্ধব নীতি এবং বিনিময় হারে ডলারের অবমূল্যায়ন নিয়ে ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা।

এরই মধ্যে বিটকয়েনের দাম ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাস দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করলেন ট্রেডিং প্লাটফর্ম কয়েনহাউজের বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনাপ্রধান থিবোল্ট ডেসাচি। তিনি বলেন, ‘ধারণা করছি, বিটকয়েনের মূল্যবৃদ্ধিতে আমরা একটি চক্রের শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এবং তাই সাবধান হওয়া প্রয়োজন। এখন বিনিয়োগের চেয়ে ট্রেডিং-ভিত্তিক অবস্থান নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে বাজারপতনের ঝামেলা এড়ানো যাবে।’

এদিকে বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, আপৎকালীন বিনিয়োগের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিশ্বব্যাপী সরকারি বাজেট ঘাটতি। কারণ কিছু সরকার বাজারে নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাজারে নগদের অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থের মূল্য সংরক্ষণে স্বর্ণ ও বিটকয়েনের মতো সম্পদে স্থানান্তর করছেন। প্রক্রিয়াটি বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে ‘ডিবেজমেন্ট ট্রেড’ হিসেবে পরিচিত।

এ পরিবর্তন স্বর্ণ ও তার ডিজিটাল বিকল্প বিটকয়েনকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠান সিটাডেলের কেন গ্রিফিন বলছেন, ‘বিনিয়োগকারীরা ডলারের প্রাধান্য কমানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন, যা একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা। আমরা ডলারের বাইরে উল্লেখযোগ্য সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি দেখছি। কারণ মানুষ তাদের পোর্টফোলিওকে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌম ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার উপায় খুঁজছে।’

সিঙ্গাপুরের ওসিবিসি ব্যাংকের রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট ক্রিস্টোফার ওয়ং বলেন, ‘স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন শাটডাউন। ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছেন; ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এক মাসব্যাপী শাটডাউনের সময় স্বর্ণের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছিল।’

তবে ওয়ং সতর্ক করে বলেন, ‘যদি চলমান দ্বন্দ্ব প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত সমাধান হয়, তাহলে স্বর্ণের দাম আবার পতনের মুখে পড়তে পারে।’

ইউওবি ব্যাংকের মার্কেটস স্ট্র্যাটেজি-প্রধান হেং কুন হাউ স্বর্ণের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এটি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে। ডলারের দুর্বলতা এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের ক্রয় বৃদ্ধিই এর মূল কারণ।

আরও